এস ডব্লিউ সাগর তালুকদার
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছাতকে আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন মিয়াকে (৫০) ঘিরে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। নানা অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেই এবার স্থানীয় জনতার হাতে গণধোলাইয়ের শিকার হওয়ার পর পুলিশের হেফাজতে নেওয়া এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি পাওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কী অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল, কারা তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিল এবং চিকিৎসা শেষে কোন প্রক্রিয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চলছে আলোচনা।
রবিবার রাত ১১টার দিকে ছাতক পৌরশহরের তাহির প্লাজা সংলগ্ন এলাকায় স্বপন মিয়াকে স্থানীয় জনতা আটক করে মারধর করে বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। তবে কী কারণে তাকে জনতার হাতে মারধরের শিকার হতে হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার সকাল থেকে স্বপনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার পর দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান অর্থের বিনিময়ে স্বপনকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, টহল পুলিশের পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
তবে পুলিশের এ বক্তব্যের পরও স্থানীয়দের প্রশ্ন—জনতার হাতে মারধরের শিকার হওয়ার পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনায় কোনো আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কি না। যদি কোনো অভিযোগে তাকে আটক করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং যদি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে তাকে আটকের কারণ কী ছিল—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
নানা অভিযোগে আলোচিত স্বপন
স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের শারফিননগর গ্রামের মৃত আবদুল মন্নানের ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। পরে বালু-পাথরের ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর তার আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে বালু-পাথরের ব্যবসা, বিভিন্ন টেন্ডার, নদী ও বালুমহালসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকটি প্রকল্পের কাজেও তার প্রভাব রয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে বালু-পাথর বিক্রির নামে অর্থ লেনদেন নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
ছাতক সিমেন্ট কারখানার বিপুল পরিমাণ স্ক্র্যাপ মালামালের টেন্ডার নিয়েও অতীতে তাকে ঘিরে বিভিন্ন আলোচনা ও অভিযোগ ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কয়েক বছর আগে কোটি টাকা মূল্যের একটি গাড়ি কেনা নিয়েও তিনি আলোচনায় আসেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। পরে সমালোচনার মুখে গাড়িটি শোরুমে ফেরত দেওয়ার কথা এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হুমকির অডিও ঘিরেও বিতর্ক
সম্প্রতি স্বপনকে ঘিরে একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে একটি গ্রামের মানুষকে হুমকি ও অশালীন ভাষায় গালাগাল করার অভিযোগ ওঠে। তবে অডিওটির সত্যতা, কণ্ঠটি স্বপনের কি না কিংবা অডিওটি সম্পাদিত কি না—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। স্থানীয়দের একটি অংশ তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের দাবি জানান।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না হওয়ায় স্থানীয়দের কেউ কেউ তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে জানানো হবে
রবিবার রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন—কেন স্বপনকে স্থানীয় জনতা আটক করে মারধর করল, কারা তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করল, পুলিশ কী অবস্থায় তাকে উদ্ধার করল এবং চিকিৎসার পর তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না।
একই সঙ্গে তাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া কী ছিল এবং তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক বা আইনগত তদন্ত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে জানানো হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং সর্বশেষ ঘটনার বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যোগাযোগ
ই-মেইল: shadhinsurjodoy@gmail.com
© ২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | স্বাধীন সূর্যোদয় | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।