
ঘোড়াঘাট(দিনাজপুর)প্রতিনিধি
উত্তরের শান্ত জনপদ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এখন মাদক এবং অনলাইন জুয়ার এক ভয়ংকর জনপদে পরিণত হয়েছে। একদিকে সীমান্ত দিয়ে আসা মাদকের জোয়ার, অন্যদিকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে অনলাইন ক্যাসিনোর মরণনেশা এই দ্বিমুখী আক্রমণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে হাজারো তরুণ-তরুণী। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উপজেলার গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এখন মাদকের ডিলার ও জুয়ার এজেন্টদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঘোড়াঘাট এলাকাটি মাদক পাচারের প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারত সীমান্ত সংলগ্ন হিলি দিয়ে আসা নিষিদ্ধ ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন এবং জীবনঘাতী অ্যাম্পুল ইনজেকশন প্রতিনিয়ত এই জনপদ দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক পাচারে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে নারী ও শিশুদের। তারা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে মাদকদ্রব্য সেট করে সাধারণ যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক বা সিএনজিতে করে নির্বিঘেœ গোবিন্দগঞ্জ হয়ে বগুড়া, ঢাকা ও রংপুরে পাচার করছে। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশিতে কিছু চালান ধরা পড়লেও, মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, “থানার পার্শ্ববর্তী অনেক এলাকায় প্রভাবশালীরা মাদকের ডিলারশিপ নিয়ে বসেছে, যারা নির্ভয়ে দিন-রাত সরবরাহ বজায় রাখছে। “মাদকের পাশাপাশি বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনো। Bet365, 1xBet, 888 Holdings-এর মতো আন্তর্জাতিক জুয়ার সাইটগুলোতে বুঁদ হয়ে থাকছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। স্মার্টফোন এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে ভিপিএন (VPN) এর মাধ্যমে এসব সাইটে প্রবেশ করছে তারা। এই জুয়ার প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)। ঘোড়াঘাটে শতাধিক ‘মাস্টার এজেন্ট’ সক্রিয় রয়েছে, যারা বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে জুয়াড়িদের থেকে টাকা সংগ্রহ করে ডিজিটাল ব্যালেন্স দিচ্ছে। লোভনীয় অফার আর সহপাঠীদের পাল্লায় পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা। জুয়ায় হেরে অনেকে চুরিতে লিপ্ত হচ্ছে, আবার কেউ কেউ রাতারাতি সম্পদশালী হওয়ার স্বপ্নে সর্বস্ব বিক্রি করে পথে বসছে। যদিও পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়, তবে স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের নিম্নপর্যায়ের কিছু সদস্যের সাথে মাদক ও জুয়াড়ি চক্রের গোপন যোগসাজশ রয়েছে। ফলে অভিযানের খবর আগেই ফাঁস হয়ে যায়। বিশেষ করে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ইদানীং মাদকের উন্মুক্ত ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এলাকার বিশিষ্টজনরা বলছেন, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে এখনও আধুনিক ও কঠোর আইনের অভাব রয়েছে। এই আইনি সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি করে অপরাধীরা একটি বিশাল ‘মানি লন্ডারিং’ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাদক ও জুয়ার এই জোড়া ছোবল কেবল শারীরিক বা মানসিকভাবে যুবসমাজকে পঙ্গু করছে না, বরং অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে সামাজিক কাঠামো তছনছ করে দিচ্ছে। ঘোড়াঘাটের সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি উপজেলার চিহ্নিত মাদক স্পটগুলোতে নিয়মিত ও বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা। অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো। পরিবারের সন্তানদের চলাফেরার ওপর অভিভাবকদের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। ঘোড়াঘাটের এই ভয়াল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, অচিরেই এই জনপদ মেধা ও জনশক্তি হারিয়ে এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে ।
তারিখঃ ০৬.০৪.২০২৬ ইং