
আব্দুল মাজেদ রানা স্টাফ রিপোর্টার বগুড়া:
মিষ্টির শহর হিসেবে পরিচিত না হলেও বগুড়ায় এবার জন্ম নিচ্ছে একেবারেই ব্যতিক্রমী এক মিষ্টান্ন। দুধ আর ছানার চিরচেনা রসগোল্লার ধারণা ভেঙে পাঙ্গাস মাছ দিয়ে তৈরি রসগোল্লা বানিয়ে চমকে দিয়েছেন বগুড়া সদরের নুরানী মোড় এলাকার গৃহবধু আশা আকতার। মাছ দিয়ে তৈরি হলেও এতে নেই কোনো ধরনের মাছের গন্ধ; বরং স্বাদে এটি নতুন, আলাদা ও চমকপ্রদ। তেমনি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। পাঙ্গাস মাছের রসগোল্লা তৈরির প্রতিটি ধাপে রয়েছে নিখুঁত যত্ন। মাছ পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে চর্বি আলাদা করা, ছানার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ—সব কিছুই তিনি করেন নিজ হাতে। এতে নিশ্চিত হয় গুণগত মান ও স্বাদের ধারাবাহিকতা।এই রসগোল্লা তৈরিতে সময় বেশি লাগে, পরিশ্রমও কম নয়। তবু তিনি বলেন,“মানুষ যদি ভালো স্বাদ পায়, তাহলেই আমার কষ্ট সার্থক।”
এই ব্যতিক্রমী রসগোল্লা শুধু একটি নতুন খাবারই নয়, বরং এটি একজন নারীর সৃজনশীলতা, সাহস ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পও বটে।তিনি জানান, পরিবারের জন্য নতুন কিছু রান্না করার চেষ্টা থেকেই তার এই ভাবনার জন্ম। বাজারে সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম দামের পাঙ্গাস মাছ কীভাবে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়—সেই চিন্তা থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা।তিনি আরো জানান,“প্রথমে অনেকেই বিশ্বাসই করেনি যে মাছ দিয়ে রসগোল্লা বানানো সম্ভব। আমি নিজেও কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু বারবার চেষ্টা করে যখন কাঙ্ক্ষিত স্বাদটা পেলাম, তখন বুঝলাম—এটা আলাদা কিছু।”এই রসগোল্লা তৈরির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতা। কখনো বেশি মাছের গন্ধ, কখনো আবার শক্ত হয়ে যাওয়া—এমন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। অবশেষে মাছের চর্বি আলাদা করা, সঠিক মাত্রায় ছানা ব্যবহার এবং নিজস্ব মসলার সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেন বিশেষ একটি রেসিপি।
আশা ভাষায়,“সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মাছের গন্ধ দূর করা। এজন্য মাছ ধোয়া, সিদ্ধ করা আর চর্বি বের করার পদ্ধতিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি।”প্রথমে দুধ জাল দিয়ে অল্প পরিমাণ ছানা তৈরি করা হয়। এরপর পাঙ্গাস মাছ ভালোভাবে পরিষ্কার করে সিদ্ধ করা হয়। সিদ্ধ মাছ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে কাঁটা আলাদা করা হয়। তারপর পরিষ্কার কাপড়ে মাছ পুঁটলি করে চাপ দিয়ে অতিরিক্ত চর্বি বের করা হয়।এরপর মাছের সঙ্গে ছানা ও নিজস্ব কিছু গোপন মসলা মিশিয়ে ভালোভাবে মেখে খামির তৈরি করা হয়। এই খামির থেকেই ছোট ছোট গোল বল বানানো হয়। পরে সেগুলো চিনি দিয়ে তৈরি ঘন সিরায় ডুবিয়ে রাখা হয়। দীর্ঘ সময় সিরায় থাকার ফলে বলগুলো নরম, রসালো ও সুস্বাদু হয়ে ওঠে।প্রথমে পরিবারের সদস্যদের দিয়েই এই রসগোল্লা খাওয়ানো হয়। ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর তা আশপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বিষয়টি এলাকায় আলোচনার জন্ম দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা করিম উদ্দিন বলেন,“শুনে অবাক হয়েছিলাম। মাছের রসগোল্লা আবার কী! কিন্তু খাওয়ার পর বুঝলাম, স্বাদে এটা একেবারেই আলাদা।”কলেজ শিক্ষার্থী জাহিদ বলেন,“আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি এতে মাছের কোনো গন্ধ নেই। নতুন কিছু খাওয়ার অভিজ্ঞতা হলো।” আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রুস্তম আলী জানান,“স্বাদ আর গন্ধে একেবারেই অন্য রকম। এমন রসগোল্লা আগে কখনো খাইনি।” স্থানীয় গৃহবধূ রোমা খাতুন বলেন,“রসগোল্লাটা খেতে খুবই ভালো লেগেছে। স্বাদটা নতুন হলেও বেশ মজার ছিল।
সংসারের কাজ সামলে এই উদ্যোগ চালিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের দৃঢ় মনোবলই তাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। অল্প পরিসরে হলেও তিনি এখন নিয়মিত পাঙ্গাস মাছের রসগোল্লা তৈরি করছেন।তিনি আরো জানান,“আমি চাই, ঘরে বসেই নারীরা যেন কিছু করতে পারে। আমার এই উদ্যোগ যদি অন্যদের অনুপ্রাণিত করে, সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।” “আমি চাই, আমার মতো সাধারণ নারীরাও সাহস পাক। সরকার বা সমাজ যদি একটু সহযোগিতা করে, তাহলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব।” ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে হলেও একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে চান তিনি। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্যাকেটজাত করে বাজারে আনার স্বপ্নও দেখছেন তিনি। প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আশা আকতার মনে করেন, নারীরা চাইলে ঘরে বসেই আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারে। বড় পুঁজি না থাকলেও নতুন চিন্তা আর পরিশ্রম থাকলে সাফল্য সম্ভব।
খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পাঙ্গাস মাছের রসগোল্লা শুধু স্বাদের নতুনত্ব নয়, বরং দেশীয় মাছের বহুমুখী ব্যবহার ও খাদ্যে উদ্ভাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সঠিক প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজারজাতকরণ পেলে এটি বগুড়ার দইয়ের পাশাপাশি পাঙ্গাস মাছের রসগোল্লা একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।একজন সাধারণ গৃহবধুর হাত ধরে জন্ম নেওয়া পাঙ্গাস মাছের রসগোল্লা প্রমাণ করে—সাহস, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতা থাকলে নতুন কিছু করা সম্ভব। বগুড়ার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হয়তো ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য জগতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।