
তিন দশকেও একটি ব্রিজ হয়নি দেউলী ঘাটে, ভোগান্তি হাজারো মানুষ
মোঃ কায়সার হাবীব পাপ্পু । ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর )প্রতিনিধি –
“যৌবনকালেই ব্রিজ পাইনি, এ বুড়া বয়সে আসে হামরা সেতুর আশা ছাড়া দিছি। সাংবাদিক হেরক (এদের) কয়া আর কি হবি, তারা কি করবার পাবি!” বুকভরা ক্ষোভ আর চোখে হতাশা নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার খাইরুল গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ তারাপদ সরকার। তার এই আর্তনাদ শুধু একজনের নয়, বরং দেউলী ঘাট এলাকার ৭ থেকে ১০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের তিন দশকের বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে ১০-১৫ জন মিলে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের কাছে তিন-চারবার ধরনা দিয়েছেন। মন্ত্রী মহোদয় নিজে এসে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও আজ অবধি সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। বর্ষা মৌসুম আসায় পানির তোড়ে সাঁকো ভেঙে গেছে, মানুষ দুর্ভোগের চরমে পৌঁছেছে, তবুও মেলেনি কোনো কার্যকর আশ্বাস। পলি-মহল্লার অবহেলিত মানুষগুলো এখন প্রশ্ন তুলছেন-জনপ্রতিনিধিরা কি কেবল ভোটের সময় আসেন?
এলাকার এক শিক্ষার্থী নাসরিন আক্তার বলেন, বর্ষায় সাঁকো দিয়ে স্কুলে যাওয়া খুব ভয় লাগে। অনেক সময় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
নদীর এপারের শ্যামপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বয়োবৃদ্ধ শচীন সহ শাহারুল, বিষ্ণু নামের একাধিক বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বছর খানেক আগে সরকারি লোক এসে সপ্তাহখানেক তাবু ফেলে নদী এলাকায় মাটি পরীক্ষা করে গিয়েছিল। গ্রামবাসী ভেবেছিল এবার হয়তো স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু সেই মাপজোক আর মাটি পরীক্ষার পর আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বন্যার সময় সাঁকো ডুবে কাঠ ভেসে গেলে মানুষকে সাঁতরে নদী পার হতে হয়।
উপজেলার ৩নং সিংড়া ইউনিয়নের মাইলা নদীর দেউলী ঘাটটি উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগের অন্যতম সংযোগপথ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ, স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও রোগীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ বাঁশ-কাঠের সাঁকো দিয়ে পার হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহনে ৫ কিমি পথ ঘুরে আসতে গিয়ে সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে চরমভাবে। বর্ষা এলেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
উপজেলা প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, ব্রিজটির জন্য মাটি পরীক্ষা করে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে এবং একাধিকবার প্রস্তাবনাও পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও বিষয়টি মন্ত্রী মহোদয়কেও জানানো হয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল আল মামুন কাওসার শেখ বলেন, এখানকার মানুষের দুর্ভোগ চরমে এবং একটি সেতু এখানে অত্যন্ত জরুরি। তবে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনীহা বা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কাজ না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
মানুষের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে। বাধ্য হয়ে তারা নিজেদের চাঁদার টাকায় ব্রিজের মাথায় ঢালাই দিয়ে কোনোমতে পারাপারের চেষ্টা করছেন। পলি-মহল্লার এই অবহেলিত জনপদ কি তবে চিরকালই উপেক্ষিত থাকবে, নাকি জনপ্রতিনিধিদের ঘুম ভাঙবে?-এখন এটাই বড় প্রশ্ন।