
মোঃ সোলায়মান গনি কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ
উত্তরের সীমানাবর্তী জেলা কুড়িগ্রাম আর কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হলো আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি)। দেশ-বিদেশে আলোচিত এই নির্মম হত্যার বিচার এখনো ভারতের উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকায় হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন ফেলানীর বাবা-মা ও সীমান্ত এলাকার মানুষ। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রত্যাশা করছেন সীমান্তবাসী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকা থেকে জানাগেছে , ১৫ বছর আগে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায় বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন। এরপর থেকে মেয়ের কবর আর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন তার বাবা-মা। দীর্ঘ দেড় যুগ পার হলেও ন্যায় বিচারের আশায় আজও ভারতের উচ্চ আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন ফেলানীর পরিবার ও সীমান্ত এলাকার মানুষ ।
আজ থেকে ১৫ বছর আগে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পাড়ি দেওয়ার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী। নিহত ফেলানীর লাশ উগ্র বিএসএফ সদস্যরা কাঁটাতারে ঝুলিয়ে দেয়, দীর্ঘ সময় কাঁটাতারের ওপর ঝুলে থাকা ফেলানীর লাশের ছবি দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার ঝড় তোলে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। তবে দু’দফা বিচারে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয় আদালত।
এরপর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহায়তায় ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতের উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। একাধিকবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও এখনো বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়নি। ফলে ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় সময় গুনছে পরিবার সহ সীমান্ত এলাকার মানুষ।
পরিবারের সঙ্গে কথা বললে ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি আসলেই বুক ফেটে কান্না আসে। আমার মেয়ের হত্যার ন্যায় বিচার হলে তবেই তার আত্মা শান্তি পাবে। হত্যাকারীর ফাঁসি চাই।’
ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, ‘১৫ বছর পার হয়ে গেল, এখনও বিচার পেলাম না। কয়েকবার ভারতে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছি, উচ্চ আদালতে রিটও করেছি। তবুও শুধু আশায় আছি—একদিন ন্যায় বিচার পাবো।’
নিহত ফেলানীর প্রতিবেশী মফিজুল ইসলাম বলেন, ফেলানী হত্যার ন্যায় বিচার হলে সীমান্তে আর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটবে না। এই বিচার সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে বড় দৃষ্টান্ত হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা রিট পিটিশনের শুনানি ও অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্তে হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে
এদিকে-কুড়িগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতের আদালতে ফেলানী হত্যাকারীর বিচার হলে বিএসএফ সদস্যরা ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করতে সাহস পাবে না। এতে সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলনিটারী গ্রামের নুর ইসলাম ও জাহানারা দম্পতির ৬ সন্তানের মধ্যে ফেলানী ছিল সবার বড়। অভাবের তাড়নায় তারা কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন। পরে ফেলানীকে বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দালালের মাধ্যমে দেশে ফেরার সময় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় কিশোরী ফেলানী খাতুন।
১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সীমান্তে ফেলানীর নাম উচ্চারিত হলে নীরব হয়ে যায় আকাশ-বাতাস—আর ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় চোখ ভিজে ওঠে একটি অসহায় পরিবারের।