
মোঃ নাজমুল হক, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গায় চাঞ্চল্যকর এক স্কুলছাত্রী অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দৃষ্টান্তমূলক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। মামলার প্রধান আসামি সালামকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি আরও ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মোট ৭০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে, যা অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত কারাভোগ করতে হবে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে চুয়াডাঙ্গা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ মো. মোক্তাগীর আলম এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা এলাকার দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে অপহৃত হন। ঘটনাটি প্রথমে নিখোঁজ হিসেবে জানা গেলেও পরবর্তীতে পরিবারের সন্দেহের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয়। তদন্তে উঠে আসে, আসামি সালাম পরিকল্পিতভাবে ওই ছাত্রীকে অপহরণ করে বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, আসামি ভিকটিমকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একটি ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে এবং সেই কাগজকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে ধর্ষণ করে। এ সময় ভিকটিম মানসিক ও শারীরিকভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হন। এক পর্যায়ে ঘটনাটি প্রকাশ পেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার করে এবং আসামিকে গ্রেফতার করে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হারুন অর রশীদ দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ, মেডিকেল রিপোর্ট এবং ভিকটিমের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে আদালত নিশ্চিত হন যে, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
রায়ে আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। একইসঙ্গে আইনের ৭ ধারায় তাকে অতিরিক্ত ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, দুটি সাজাই পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এম এম শাহজাহান মুকুল রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বর্তমান সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আদালতের এমন কঠোর রায় সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেবে এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগীর পরিবার দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই শেষে ন্যায়বিচার পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এই রায় তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করেছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ জনগণও এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ কমাতে সহায়ক হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।