
আরিফুল হক জিসান, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন ও চট্টগ্রামের স্থানীয় নেত্রী সাদিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে দলীয় পদ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মদের বারে নিয়ে এক নারী কর্মীকে যৌন হয়রানি ও অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। ওই নারী কর্মীর দাবি— ‘ডিল অর ডেথ’ (হয় চুক্তি, না হয় মৃত্যু) বলে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং এর প্রতিবাদ করায় তাকে বলা হয়েছে, “রাজনীতি করতে হলে বড় নেতাদের পার্সোনাল সময় দিতে হয়, এটাই রাজনৈতিক কালচার।”
গত শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ির একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন ডেকে দলটির ওই পদপ্রত্যাশী নারী কর্মী কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের এই অন্ধকার অধ্যায়ের কথা ফাঁস করেন। এতে সাংগঠনিক বৈঠকের নামে সুকৌশলে প্রতারণা করে আবাসিক হোটেলের বারে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযুক্ত আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য জেলা বান্দরবান থেকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত সাদিয়া আফরিন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব এবং দলটির সহযোগী সংগঠন ‘জাতীয় নারীশক্তি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ওই তরুণী নিজেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং চট্টগ্রাম মহানগর নারীশক্তির শীর্ষ পদপ্রত্যাশী হিসেবে পরিচয় দেন।
লিখিত বক্তব্যে ওই তরুণী জানান, পূর্বপরিচিত ও দলীয় নেত্রী সাদিয়া আফরিন নতুন কমিটির বিষয়ে জরুরি সাংগঠনিক আলোচনার কথা বলে গত ১৪ জুন সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে চট্টগ্রামের অভিজাত হোটেল ‘পেনিনসুলা’র টপ ফ্লোরে যেতে বলেন। সেখানে যাওয়ার পর তিনি দেখতে পান সেটি মূলত একটি মদের বার। ওই বারের একটি টেবিলে সুজা উদ্দিন আরও দুজন পুরুষ এবং একমাত্র নারী হিসেবে সাদিয়াকে নিয়ে বসে মদ্যপান করছিলেন।
তরুণী অভিযোগ করেন, তিনি টেবিলে বসার পর সুজা উদ্দিন তাকে নানাভাবে ধূমপান ও মদ্যপানে উৎসাহিত করেন এবং তাকে কী ধরনের ড্রিংকস দেওয়া হবে তা জানতে চান। এ সময় সুজার চোখ-মুখ ও কথাবার্তায় সম্পূর্ণ মদ্যপ অবস্থা প্রকাশ পাচ্ছিল। পরিবেশ দেখে তরুণী অস্বস্তিবোধ করলে নেত্রী সাদিয়া তাকে আশ্বস্ত না করে উল্টো চাপ প্রয়োগ করে বলেন, “সুজা উদ্দিন যেভাবে বলেন, সেভাবেই তোমাকে চলতে হবে।” এর কয়েক মিনিটের মাথায় সাদিয়া হঠাৎ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বাহানা দিয়ে কৌশলে বারের টেবিল থেকে উঠে চলে যান।
তরুণীর ভাষ্যমতে, সাদিয়া চলে যাওয়ার পর সুজা উদ্দিন তাকে কয়েকবার সোফা ছেড়ে তাঁর গা ঘেঁষে পাশে এসে বসার জন্য নির্দেশ দেন। সুজার তাকানো, অঙ্গভঙ্গি এবং আচরণ ছিল যথেষ্ট আপত্তিকর, অশালীন ও চরম যৌন হয়রানিমূলক। চরম অস্বস্তির মধ্যে তরুণী সেখান থেকে চলে আসতে চাইলে সুজা উদ্দিন সরাসরি থ্রেট দিয়ে বলেন— ‘ডিল অর ডেথ’। বড় রাজনৈতিক সুবিধা, কাঙ্ক্ষিত পদ-পদবি এবং বিপুল আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে সুজা তাকে রাত কাটানোর জন্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হোটেল থেকে কোনোমতে প্রাণভয়ে বেরিয়ে তরুণী যখন সাদিয়াকে ফোনে এই নোংরা কালচারের তীব্র প্রতিবাদ জানান, তখন সাদিয়া অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় উত্তর দেন, “রাজনীতি করতে হলে বড় পদ-পদবিধারীদের পার্সোনাল সময় দিতে হয়। এটাই আমাদের রাজনৈতিক কালচার।”
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন জানিয়ে ভুক্তভোগী ওই নারী কর্মী অবিলম্বে এনসিপির কেন্দ্রীয় প্রধানদের কাছে এই লম্পট নেতা ও প্ররোচনাকারী নেত্রীর বহিষ্কার এবং প্রশাসনের কাছে তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের সচেতন রাজনৈতিক মহলে।